১৯ মার্চ, ২০২৫

সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবনা ০২ : সংবিধানের মূলনীতিতে জাতীয়তাবাদ থাকা যাবে না



বর্তমান বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় রয়েছে, সংবিধানের মূলনীতি হবে চারটি, এর একটি হলো জাতীয়তাবাদ। সংবিধানের এই মূলনীতি ইসলামবিরুদ্ধ। এই মূলনীতি মুসলিমদের সংবিধানে থাকতে পারে না।

জাতীয়তাবাদ সাধারণত একটি সুস্থ ও নিষ্পাপ ভাবধারা থেকে সৃষ্টি হয়। আর সেটি হলো এক সমষ্টির মানুষ নিজেদের মিলিত স্বার্থ ও কল্যাণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্মিলিতভাবে কাজ করবে এবং সামাজিক ও সামগ্রিক প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্যে এক জাতি হয়ে জীবন যাপন করবে।

জাতি গঠনের মূলে এটাই হয় প্রথম উদ্দেশ্য। কিন্তু একটি জাতি গঠিত হওয়ার পর জাতীয় বিদ্বেষ ভাবের প্রচণ্ড প্রভাব তার উপর অনিবার্য রূপেই আবর্তিত হয়ে থাকে। এমনকি, এ জাতীয়তা ক্রমশ যতোই কঠিন ও সুদৃঢ় হয়ে উঠে, জাতীয়তার বিদ্বেষ ভাব এবং পার্থক্যবোধও ততোই প্রচণ্ড হয়ে উঠে।

একটি জাতি যখন নিজের স্বার্থ লাভের এবং নিজেদের কল্যাণ ব্যবস্থা সংরক্ষণের জন্যে নিজেদেরকে পরস্পর ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করে নেয়-অন্য কথায় নিজেদের চতুঃসীমায় জাতীয়তার দুর্ভেদ্য প্রাচীর স্থাপিত করে তখন উক্ত প্রাচীরের আভ্যন্তরীণ ও বহিরস্থ লোকদের পরস্পরের মধ্যে ‘আপন’ ও ‘পর’ বলে অবশ্যম্ভাবীরূপে পার্থক্য করবেই। প্রত্যেক ব্যাপারেই নিজেদেরকে অপরের উপর প্রাধান্য ও গুরুত্ব দিবেই। অপরের মুকাবিলায় নিজের প্রতিরক্ষা করবেই।

উল্লিখিত ‘আপন’ ও ‘পরের’ পারস্পারিক স্বার্থে যদি কখনো সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তখন এই জাতীয়তা নিজের স্বার্থ সংরক্ষনের জন্যে প্রাণপন চেষ্টা করবে-অন্যের স্বার্থ বলি দিতেও তা বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হবে না। এসব কারণেই সেসবের মধ্যে যুদ্ধ হবে-সন্ধি হবে, কিন্তু এ শান্তি ও সংগ্রাম-উভয় অবস্থায়ই উভয়ের মধ্যে পর্বত সমান পার্থক্যসূচক প্রাচীর মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর জাতীয়তার ভিত্তিতে এসব কার্যক্রম সবই হারাম।

কোন ব্যক্তি যখন শুধুমাত্র নিজের জাতির (এলাকাভিত্তিক, ভাষাভিত্তিক, বর্ণভিত্তিক) ভাষা কিংবা পতাকা নিয়ে গর্ব বোধ করে, অন্যান্য দেশ ও জাতিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে বিচার করে, অন্য জাতিকে ঘৃণা করে যদিও তারা মুসলিম হয়, অন্যান্য দেশ ও জাতির তুলনায় নিজের দেশ ও জাতিকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তখন তার সেই মনোভাব বা আদর্শকে জাতীয়তাবাদ বলা হয়।

জাতীয়তাবাদ / জাতিবাদ / গোত্রবাদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ সা.-এর বক্তব্য

এক.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নেতার আনুগত্য হতে বের হয়ে যায় এবং মুসলিমদের দল ত্যাগ করে, আর এই অবস্থায় মারা যায়, তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে ভাল-মন্দ নির্বিচারে হত্যা করে এবং মুসলিমকেও ছাড়ে না; আর যার সাথে যে অঙ্গীকারাবদ্ধ, তার অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার সাথে আমার কোন সম্বন্ধ থাকবে না। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতার পতাকাতলে যুদ্ধ করে, আর লোকদেরকে জাতিয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে এবং তার ক্রোধ জাতিয়তাবাদের জন্যই হয়, পরে সে নিহত হয়; তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে।
সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ৪১১৪

দুই.
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লোকেদেরকে গোত্রবাদের দিকে আহবান করে অথবা গোত্রবাদে উন্মত্ত হয়ে ভ্রষ্টতার পতাকাতলে যুদ্ধ করে নিহত হলে সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করলো।
সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৯৪৮

ফাসীলাহ্ বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! কোন ব্যক্তির নিজের গোত্রকে ভালোবাসা কি ’আসাবিয়্যাতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না; বরং ’আসাবিয়্যাত হলো কোন ব্যক্তির নিজের গোত্রকে যুলমে সাহায্য করা। (আহমাদ ও ইবনু মাজাহ)

ইসলাম একে জাহেলিয়াত বলে ঘোষণা করেছে। ইসলামে আরব অনারব, সাদা কালো, দেশি বিদেশি সকল মুসলিমকেই সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি মুসলিম হয় তাহলে সে ভারতীয়, পাকিস্থানি অথবা অন্য যে কোন দেশের নাগরিক হোক না কেন, সে আমাদের দ্বীনি ভাই। মুসলিমদের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের পার্থক্য হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে, জাতীয়তা কিংবা দেশীয় নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নয়। কেউ যদি ইসলামের বিরোধীতা করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করে তাহলে সে স্বদেশী হলেও সে আর আমি এক জাতি নই।

তিন.
জাতীয়তাবাদ, গোত্র প্রীতি, বংশীয় আভিজাত্য ও অহংকারবোধকে আরবী পরিভাষায় আসাবিয়্যাহ বলা হয়। এই আসাবিয়্যাহ এর কুফল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর কারণে মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর কারণে যুদ্ধ করে। [আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১২১]

চার.
জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেনঃ হে লোক সকল শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের, কৃষ্ণকায়ের উপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের উপর কৃষ্ণকায়ের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল তাকওয়ার কারণেই। [ইমাম আহমাদ, আল মুসনাদ, হাদিস নং ২৩৪৮৯]

কেন জাতীয়তাবাদ ক্ষতিকর?

এক.
ইসলামের একটি মূলনীতি হলো “আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ”। জাতীয়তাবাদের ফলে এই মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়। 'আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ এর মর্মার্থ হলো আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্যই ঘৃণা। একজন মুসলিমের প্রতি আরেকজন মুসলিমের ভালোবাসা থাকতে হবে আল্লাহর জন্যই। ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী কাফির মুনাফিকদের প্রতি অন্তরে ঘৃণা থাকতে হবে আল্লাহর জন্যই। কোন পার্থিব স্বার্থের জন্য নয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদ মুসলিমদের এই সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল তৈরি করে দেয়। ভিনদেশের মুসলিমকে তখন আর আপন ভাবা যায় না। অন্যদিকে নিজ দেশের আল্লাহদ্রোহীর প্রতিও সহানুভূতি চলে আসে।

দুই.
জাতীয়তাবাদ মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ধ্বংস করে দেয়। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে একজন মুসলিমের কষ্টে সমস্ত পৃথিবীর মুসলিমের অন্তরে কষ্ট অনুভূত হবে, এটিই ইসলামের শিক্ষা। অথচ জাতীয়তাবাদ আমাদের সেই অনুভূতি নষ্ট করে দিয়েছে। নিজ দেশের কিংবা নিজ জাতির মানুষ সুখে থাকলেই আমরা খুশি। আর এরূপ স্বার্থপরতাই হচ্ছে জাতীয়তাবাদের মূল শিক্ষা। বিংশ শতকের শুরুতে জাতীরাষ্ট্র ধারণা থেকেই আমাদের উম্মাহ চেতনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমরা আরব-তুর্কি, আরব-আফ্রিকান, তুর্কি-হিন্দুস্তানী এসব ভাবে ভাগ যুদ্ধ শুরু করেছি। সেই উম্মাহ ভেঙ্গে এখন বাঙালি, সিন্ধি, বেলুচ, পাঞ্জাবি ইত্যাদি জাতিতে ভাগ হয়ে গিয়েছি।

তিন.
জাতীয়তাবাদ নিজের জাতিকে অন্যান্য জাতি থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায়। ইসলামে নিজ জাতিকে নিয়ে অহংকার কিংবা বংশ মর্যাদার গৌরব চরম নিন্দনীয়। ইসলাম এরূপ কর্মকে জাহেলি যুগের কর্ম বলে উল্লেখ করেছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হলো তাকওয়া। এক্ষেত্রে গায়ের রঙ, বংশ, জাতি, ভাষা, ভূখণ্ড ইত্যাদি মূল্যহীন। আল্লাহর রাসূল বিদায় হজ্বের ভাষণেও এই ধরণের জাতিভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

চার.
জাতীয়তাবাদ ন্যায় অন্যায় বোধকে নষ্ট করে দেয়। জাতীয়তাবাদের দাবিই হলো নিজের স্বজাতিকে সাহায্য করা হবে যদিও সে অন্যায় করে এবং অন্য জাতিকে সাহায্য করা হবে না যদিও তারা নিরপরাধ হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করা হবে, যদিও সে নিজ সম্প্রদায় কিংবা নিজ দেশের নাগরিক হয়।

বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে এক মুহাজির ও এক আনসার সাহাবীর মধ্যে বিতর্ক শুরু হলে উভয়ই তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়কে ডেকে মারামারি করার জন্য উদ্ধত হলো। মুহাম্মদ সা. এই ধরণের কাজের কঠোর নিন্দা করেছেন এবং এই কাজকে জাহেলি দুর্গন্ধময় কাজ বলেছেন।

অতএব যে সংবিধানের মূলনীতিতে জাতিয়তাবাদ থাকবে তা জাতিকে ভুল পথে, জাহেলিয়্যাতের পথে পরিচালিত করবে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন